ইসলামের দৃষ্টিতে অনশন |Islamic life

 

ইসলামের দৃষ্টিতে অনশন |Islamic life


ইসলামের দৃষ্টিতে অনশন
ইসলামের দৃষ্টিতে অনশন



অনশন মানে হলো কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্বেচ্ছায় খাদ্যগ্রহণ থেকে বিরত থাকা। এটি একধরনের উপবাস, যা কখনো ধর্মীয় কারণে, আবার কখনো রাজনৈতিক প্রতিবাদের উদ্দেশ্যে করা হয়। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে অনশন—বিশেষ করে দীর্ঘ সময় খাদ্য ত্যাগ করে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া—একটি নিষিদ্ধ ও গুরুতর গুনাহের কাজ।

 অনশন কী ও এর প্রকারভেদ

অনশন সাধারণভাবে তিন প্রকার হতে পারে—

  1. স্বল্প অনশন: কিছু সময়ের জন্য খাদ্যগ্রহণ বন্ধ রাখা।

  2. অর্ধ অনশন: আংশিকভাবে খাবার গ্রহণ বন্ধ রাখা।

  3. পূর্ণ অনশন: একেবারেই কিছু না খাওয়া বা পান না করা, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

অনেক ধর্মেই উপবাস বা অনশনের প্রচলন রয়েছে। যেমন হিন্দুধর্মে পূজা-পার্বণ বা ব্রত পালনের আগে অনশন করার নিয়ম আছে। কিন্তু ইসলামে এই ধরনের অনশন কোনোভাবেই অনুমোদিত নয়, বরং এটি আত্মঘাতী কাজ হিসেবে গণ্য হয়।

 ইসলামের দৃষ্টিতে অনশন হারাম কেন?

ইসলাম জীবন রক্ষা ও শরীরের যত্নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। একজন মুসলমানের জন্য শরীরকে কর্মক্ষম ও সুস্থ রাখা ফরজ বা বাধ্যতামূলক।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—

“তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।”
(সুরা আন-নিসা, আয়াত: ২৯)

আরও এক স্থানে বলেছেন—

“তোমরা নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।”
(সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৯৫)

অতএব, যে কেউ সচেতনভাবে না খেয়ে নিজের মৃত্যু ডেকে আনে, সে একপ্রকার আত্মহত্যা করছে—যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

 ইসলামী ফিকহবিদদের মতামত

আল্লামা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আবি সৌদ (রহ.) তাঁর ফাতহুল মঈন গ্রন্থে লিখেছেন—

“মৃত্যু থেকে বাঁচার জন্য খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করা ফরজ।”

একইভাবে ফাতাওয়া আলমগীরী-তে বলা হয়েছে—

“যতটুকু খেলে জীবন রক্ষা পায়, ততটুকু খাওয়া ফরজ। কেউ যদি খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয় এবং সেই কারণে মারা যায়, তবে সে অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে।”

অর্থাৎ খাওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও না খাওয়া এবং তাতে মৃত্যু ঘটলে তা গুরুতর পাপ।

 আত্মহত্যা সম্পর্কিত নবী করিম (সা.)-এর সতর্কবাণী

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

“যে ব্যক্তি কোন বস্তু দ্বারা আত্মহত্যা করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নামে ঐ বস্তু দিয়েই শাস্তি দিবেন।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০৪)

অন্য এক হাদিসে এসেছে—

“যে ব্যক্তি লৌহ অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করবে, সে সেই অস্ত্র দিয়ে জাহান্নামে নিজেকে বিদ্ধ করতে থাকবে; আর যে বিষপান করে আত্মহত্যা করবে, সে চিরকাল জাহান্নামে সেই বিষ পান করতে থাকবে।”
(তিরমিজি, হাদিস: ২০৪৪)

অতএব, খাদ্য ত্যাগ করে প্রতিবাদের নামে নিজের মৃত্যু ডেকে আনা ইসলাম অনুযায়ী আত্মহত্যার সমান।

ইসলাম ভারসাম্য ও সংযমের ধর্ম

ইসলাম সবকিছুতেই ভারসাম্য ও সংযম বজায় রাখতে নির্দেশ দেয়। অতিরিক্ততা বা বাড়াবাড়ি ইসলাম পছন্দ করে না—তা ইবাদতের ক্ষেত্রেই হোক বা দুনিয়াবি বিষয়ে।

এক হাদিসে বর্ণিত—

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন, আমি নবী (সা.)-কে বলেছিলাম, আমি সারাজীবন রোজা রাখব ও রাতে ইবাদত করব। তখন রাসুল (সা.) বললেন, “তুমি তা পারবে না। সওমও পালন করো, আবার ইফতারও করো; রাতে ইবাদতও করো, আবার ঘুমাও।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪১৮)

এই হাদিস থেকেই বোঝা যায়, ইসলামে সংযম ও ভারসাম্যই প্রকৃত পথ।

উপসংহার

ইসলাম জীবন, স্বাস্থ্য ও ভারসাম্য রক্ষার ধর্ম। তাই কোনো দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য বা রাজনৈতিক প্রতিবাদের অংশ হিসেবে অনশন করা ইসলামি দৃষ্টিতে হারাম ও আত্মঘাতী আচরণ। মুসলমানের উচিত প্রতিটি কাজে ইসলামের নির্ধারিত সীমারেখা মেনে চলা।

আল্লাহ বলেন: “তিনি তোমাদের নিজের উপর কোনো কষ্ট চাপিয়ে দেননি।”
(সুরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৭৮)

অতএব, শরীর ও জীবন সংরক্ষণ করা যেমন ফরজ, তেমনি নিজেকে ক্ষতির মুখে ফেলা হারাম। ইসলামে অনশন কোনো বৈধ প্রতিবাদের উপায় নয়।

ইসলামে অনশন, ইসলামিক দৃষ্টিতে অনশন, আত্মহত্যা ইসলাম, ধর্মীয় অনশন, ইসলামী ফিকহ, ইসলামিক জীবনধারা


  • ইসলামে অনশন করা যায় কি

  • অনশন সম্পর্কে ইসলাম কী বলে

  • ইসলামের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক অনশন

  • আত্মহত্যা সম্পর্কে ইসলামী মতামত

  • কোরআন ও হাদিসে অনশন

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url